নরমাল ডেলিভারিতে সাইড কাটা (এপিসিওটমি) সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন

নরমাল ডেলিভারিতে সাইড কাটা (এপিসিওটমি)

নরমাল ডেলিভারিতে সন্তান প্রসবের সময় প্রয়োজন হলে পেরিনিয়ামের (যোনিপথ ও পায়ুপথের মধ্যবর্তী স্থান) অংশবিশেষ কেটে দেওয়া হয়, যাতে বাচ্চা সহজে বেরিয়ে আসতে পারে। এটি অনেকের কাছে সাইড কাটা নামে পরিচিত। অজ্ঞতাবশত কেউ কেউ একে "সাইড সিজার" বা "ছোট সিজার"ও বলেন, অথচ এপিসিওটমি আর সিজারিয়ান সেকশনের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে।

সাধারণত গর্ভের সন্তান আকারে বড় হলে, বাচ্চার অবস্থান অস্বাভাবিক হলে, দ্রুত প্রসব করানোর প্রয়োজন হলে, বেশি ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে কিংবা ফোরসেপ বা ভ্যাকুয়াম ডেলিভারির প্রয়োজনে সাইড কাটার দরকার হয়। প্রয়োজনের সময় না কাটলে অস্বাভাবিকভাবে ছিঁড়ে যেতে পারে, যা মেরামত করা কষ্টসাধ্য।

স্বাভাবিক প্রসবের সময় এপিসিওটমির দরকার হতে পারে, তাই আগেই লিখিত সম্মতি নিয়ে রাখা হয়। এ কারণে কাটার সময় আর নতুন করে সম্মতি নেওয়া হয় না।

জেনে রাখুন: গুগল, ইউটিউব ও ফেসবুকে অনেকে এপিসিওটমি নিয়ে অতিরঞ্জিত তথ্য ছড়ান, যার ফলে প্রসূতি ও তাঁর পরিবারে অকারণ ভীতি তৈরি হয়। কার সাইড কাটা লাগবে, তা আগে থেকে নিশ্চিত করে বলা যায় না; শুধু ধারণা করা যায়। তাই আগে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। প্রসব শুরুর পর প্রয়োজন হলেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, আর দরকার না হলে অপ্রয়োজনে এটি করা উচিত নয়।

সাইড কাটার কারণ

যেসব কারণে সাইড কাটা (এপিসিওটমি) প্রয়োজন হতে পারে:

  1. গর্ভের শিশু আকারে বড় ও ওজন বেশি হলে।
  2. মায়ের যোনিপথের শেষ অংশের প্রশস্ততা কম ও বাচ্চার মাথা বড় হলে।
  3. প্রসবকালে পেরিনিয়াম ছিঁড়ে যাওয়া ও ক্ষতবিক্ষত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে।
  4. গর্ভের শিশু ব্রিচ প্রেজেন্টেশনে (উল্টো অবস্থানে) থাকলে।
  5. লেবারের শেষ দিকে অক্সিজেনের অভাবে শিশুর ফিটাল ডিসট্রেস শুরু হলে এবং দ্রুত বের করে আনার প্রয়োজন হলে।
  6. ফোরসেপ ডেলিভারির প্রয়োজনে।
  7. বাচ্চার মাথা অনেকক্ষণ যোনিপথের শেষ অংশে আটকে থাকলে; তখন সাইড কেটে দিলে সহজে বের করা যায়।

যেভাবে সাইড কাটা হয়

সাইড কাটার কয়েকটি উপায় আছে। Midline এপিসিওটমিতে পেরিনিয়ামের মাঝ বরাবর উপর থেকে নিচের দিকে, অর্থাৎ যোনি থেকে মলদ্বারের দিকে সোজা করে কাটা হয়। এতে কাটা সহজ, কিন্তু মলদ্বার ছিঁড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে, তাই সাধারণত এভাবে কাটা হয় না।

এপিসিওটমির ধরন
সবচেয়ে নিরাপদ হলো Mediolateral এপিসিওটমি

Mediolateral এপিসিওটমিতে পেরিনিয়ামের উপর থেকে কোনাকুনিভাবে ডানে বা বামে, নিচের দিকে ৪৫ ডিগ্রি কোণে কাটা হয়; অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডান দিকে। এতে কাটা বড় হয়ে পায়ুপথ ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলক কম থাকে। এ পদ্ধতিতে সেলাই করা কিছুটা কষ্টসাধ্য এবং রক্তক্ষরণও বেশি হতে পারে, তবু সাধারণত এটিই পরামর্শ দেওয়া হয়।

পেরিনিয়াল টিয়ারের বিভিন্ন ধরন
পেরিনিয়াম ছেঁড়ার মাত্রা ১ম থেকে ৪র্থ ডিগ্রি দিয়ে বোঝানো হয়। ১ম ডিগ্রি মানে সবচেয়ে কম ছেঁড়া।

সাইড কাটার ধাপ

প্রথমে কাটার স্থানটি অবশ করা হয়। প্রসবের জন্য আগেই অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়া থাকলে আলাদা ওষুধের প্রয়োজন হয় না। অ্যানেস্থেসিয়া না দেওয়া থাকলে বা এর কার্যকারিতা শেষ হয়ে এলে ইনজেকশনের মাধ্যমে পেরিনিয়াম অবশ করা হয়, ফলে কাটার সময় ব্যথা অনুভূত হয় না। এরপর সার্জিকাল কাঁচি দিয়ে ওই স্থানে কাটা হয়। সন্তান প্রসবের পরপরই পেরিনিয়ামের টিস্যু ও মাংসপেশি সেলাই করে দেওয়া হয়।

সেলাই ও সেরে ওঠা

সেলাইয়ের সুতো শুকিয়ে গেলে নিজে থেকেই শরীরের সঙ্গে মিশে যায়, তাই সেলাই খুলতে হাসপাতালে যেতে হয় না। কতটুকু কাটা হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে শুকাতে প্রসবের পর কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

  • দুই-তিন সপ্তাহ পর্যন্ত হাঁটা বা বসার সময় অল্প ব্যথা হতে পারে।
  • সুতোর কারণে কিছুটা অস্বস্তি হতে পারে, যা কয়েক দিনে স্বাভাবিক হয়ে যায়।
  • শুরুতে প্রস্রাবের সময় সেলাইয়ের স্থানে জ্বলতে পারে।
  • পায়খানার সময়ও ব্যথা অনুভূত হতে পারে।

সাইড কাটার যত্ন

কাটা সেরে উঠতে কারও কম সময় লাগে, কারও বেশি। এটি নির্ভর করে প্রসূতির শারীরিক অবস্থা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও যত্নের ওপর। অবহেলা করলে সেরে উঠতে দেরি হতে পারে, এমনকি ইনফেকশনও হতে পারে।

❑ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা

  • প্রতিদিন কাটা স্থান পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুতে হবে; ক্ষত যতটা সম্ভব পরিষ্কার রাখুন।
  • কয়েক ঘণ্টা পরপর স্যানিটারি প্যাড বদলান।
  • প্রস্রাব-পায়খানার পর সামনে থেকে পেছনের দিকে ধুতে হবে এবং প্রতিবার সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুতে হবে।
  • বিছানায় কাপড় বিছিয়ে নিচের অংশের পোশাক ও অন্তর্বাস খুলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে পারেন। খোলা বাতাস লাগলে কাটা দ্রুত সেরে উঠতে সাহায্য করে।

❑ ব্যথা কমানোর উপায়

এপিসিওটমির পর কয়েক সপ্তাহ ব্যথা থাকা স্বাভাবিক। ব্যথা কমাতে যা করতে পারেন:

  • সেলাইয়ের পরপর ব্যথা হলে রুমাল বা তোয়ালেতে বরফ পেঁচিয়ে কাটা স্থানে ঠান্ডা সেঁক দিন।
  • তিন-পাঁচ দিন পর থেকে গোসলের সময় ও টয়লেটের পর কুসুম গরম পানি ব্যবহার করতে পারেন।
  • বসার সময় সাবধানে বসুন। আরাম পেতে গোল আকৃতির কুশন বা নরম বালিশ ব্যবহার করতে পারেন।
  • ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল খেতে পারেন। বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় অ্যাসপিরিন খাওয়া যাবে না। অন্য কোনো ব্যথানাশক চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নয়।
  • বড় গামলায় কুসুম গরম পানি নিয়ে তাতে বসে 'হিপ বাথ' নিলে উপকার পাওয়া যায়।
প্রসব-পরবর্তী গোল কুশন
আরাম করে বসার জন্য গোল আকৃতির কুশন ব্যবহার করতে পারেন
হিপ বাথ
কুসুম গরম পানিতে বসে 'হিপ বাথ' নিলে আরাম পাওয়া যায়

❑ অন্যান্য পরামর্শ

  • কোষ্ঠকাঠিন্য যেন কোনোভাবেই না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
  • এর ঝুঁকি কমাতে প্রতিদিন অন্তত ২ লিটার পানি ও পর্যাপ্ত পানীয় পান করুন।
  • ফলমূল, শাকসবজি ও ইসবগুলের ভুসি খেতে পারেন।
  • সমস্যা বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে পায়খানা নরম করার ওষুধ নিন।
  • নবজাতকের যত্ন নিতে গিয়ে মায়েরা অনেক সময় নিজের যত্ন নিতে ভুলে যান। শিশু ঘুমালে আপনিও একটু ঘুমিয়ে নিন। পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম সুস্থতায় সহায়ক। একা সামলাতে না পারলে পরিবারের সদস্যদের সাহায্য নিন।
কেগেল ব্যায়াম

💡 ব্যায়াম: প্রসবের কিছুদিন পর থেকে তলপেটের ব্যায়াম করতে পারেন, এতে পেশির শক্তি ফিরে আসে। এ সময় 'কেগেল ব্যায়াম' করা যায়, যার পদ্ধতির অনেক ভিডিও ইউটিউবে পাওয়া যায়। নিয়মিত করলে যৌন মিলনে সমস্যা এবং প্রস্রাব-পায়খানা ধরে রাখার সমস্যা কমে আসে।

সাইড কাটার ফলে সৃষ্ট জটিলতা

এপিসিওটমি প্রসূতির জন্য নিরাপদ একটি ছোট অপারেশন। তবু কারও কারও কিছু জটিলতা হতে পারে। কাটা অংশে ইনফেকশন হলে আশপাশ লালচে ও ফোলা হতে পারে, ব্যথা থাকতে পারে, এমনকি ক্ষত থেকে পুঁজ বা দুর্গন্ধ বের হতে পারে।

⚠️ এসব ক্ষেত্রে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:

  • কাটা স্থান দীর্ঘ সময়েও না শুকালে
  • ব্যথা অতিরিক্ত বেশি হলে
  • প্রস্রাব-পায়খানা ধরে রাখতে সমস্যা হলে
  • পুঁজ, দুর্গন্ধ, লালচে ভাব বা ফোলা দেখা দিলে

কাটা শুকানোর পর কারও কারও ক্ষেত্রে দাগ ত্বকের সঙ্গে পুরোপুরি মিশে না গিয়ে সামান্য উঁচু থাকতে পারে, কিংবা চুলকানি হতে পারে। তবে এর সম্ভাবনা খুবই কম।

বিস্তারিত ভিডিও

প্রশ্নোত্তর

১ম বার সাইড কাটলে কি ২য় বারও কাটতে হয়?

এটি দ্বিতীয় গর্ভাবস্থার কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে, যেমন শিশুর আকার ও অবস্থান। সাধারণত অনেকেরই ২য় বার সাইড কাটার প্রয়োজন হয় না।

নরমাল ডেলিভারিতে সবার কি সাইড কাটতে হয়?

না, সবার দরকার হয় না। ডেলিভারির সময় মা ও বাচ্চার অবস্থা বুঝে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সাইড কাটার সেলাই কি কাটতে হয়?

না, এই সুতো নিজে নিজেই খুলে পড়ে যায়। তবে ডেলিভারি-পরবর্তী ফলোআপে গেলে চিকিৎসক দেখে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবেন।

সাইড কাটলে কি সহবাসে সমস্যা হয়?

সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হয় না। প্রথম দিকে যৌন মিলনে ব্যথা হওয়া স্বাভাবিক, কারও কারও ক্ষেত্রে অস্বস্তি কয়েক মাস পর্যন্ত থাকতে পারে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই; স্বামী-স্ত্রী উভয়ে ধৈর্য ধরলে সময়ের সঙ্গে সমস্যা ঠিক হয়ে যায়। দেড় মাস পর থেকে সমস্যা হলে লুব্রিকেন্ট ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়।

সাইড কাটা ভালো নাকি সিজার?

সিজার একটি মেজর অপারেশন; এতে পুরো পেট কেটে অজ্ঞান করতে হয় এবং পরবর্তীতে নানা জটিলতা হতে পারে। অন্যদিকে সাইড কাটায় লোকাল অ্যানেস্থেসিয়া দিয়ে যোনির এক পাশে সামান্য কাটা হয়। প্রসবের তীব্র ব্যথার মধ্যে অনেক প্রসূতি কাটার বিষয়টি টেরই পান না। তবে কোনটি প্রয়োজন, তা মা ও শিশুর অবস্থা দেখে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।